চন্দ্রনাথ ধামের বাড়বকুন্ডে মন্দিরের কিছু অংশ ভাঙচুর ও হনুমান বিগ্রহ চুরি

বাড়বকুন্ড ও লবণাক্ষের মন্দিরগুলো বিলুপ্তির পথে, চন্দ্রনাথ ধামের প্রায় তিন হাজার একর ভূমি বেদখল"
সংগ্রাম দত্ত:
গত ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলার চন্দ্রনাথ ধামের অংশ বাড়বকুন্ড মন্দিরের কিছু অংশ ভাঙচুর ও হনুমান বিগ্রহ চুরি হবার খবর পাওয়া গেছে। বাড়বকুন্ড ও লবণাক্ষ তীর্থক্ষেত্রে মন্দির গুলো বিলুপ্তির পথে। চন্দ্রনাথ ধামের প্রায় তিন হাজার একরের ওপর ভূমি বেদখল হয়ে গেছে বলে জানা গেছে । এসব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচুর পোস্ট দেখা যাচ্ছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র তীর্থ ক্ষেত্র চন্দ্রনাথ ধাম ও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ গুলোর অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিছুদিন পূর্বে চট্টগ্রাম প্রবর্তক ধামের অধ্যক্ষ চিন্ময় ব্রহ্মচারীর নেতৃত্বে প্রায় দেড়শতাধিক সনাতনী সাধু পরবর্তীতে বাংলাদেশ হিন্দু মহাজুটের সাধারণ সম্পাদক শ্রী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামানিকের নেতৃত্বে নেতৃবৃন্দ চন্দ্রনাথ ধাম ও তার অংশগুলোর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। সনাতনী নেতারা চন্দ্রনাথ ধাম রক্ষা ও বাড়বকুন্ড পুরোহিতের উপর সন্ত্রাসী হামলা ও জমি দখলের পাঁয়তারার বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ গভীর রাতে
সীতাকুণ্ড মহাতীর্থের বাড়বকুন্ডে স ন্ত্রা সী হা ম লা য় মন্দিরের কিছু অংশ ভাং চুর এবং হনুমান বিগ্রহ চুরি করে নিয়ে গেছে। কিছুদিন আগে একটি চিহ্নিত ভূমি দস্যু গ্রুপ বাড়বকুণ্ড জ্বালামুখী শ্রী বিগ্রহ মন্দিরের সেবায়েতদের উপর হামলা করে এবং সেবায়েতদের প্রাণ নাশের হু ম কি দিয়েছে বলে চট্টগ্রামের সাংবাদিক অর্ক আইচ তাঁর ফেসবুক পোস্টে ভিডিও সহ পোস্ট করেছেন।

সাংবাদিক সৌমিত্র চক্রবর্তী গত ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ দৈনিক কালের কন্ঠ পত্রিকায় "হারিয়ে যাচ্ছে লবণাক্ষ তীর্থের মঠ-মন্দির" শীর্ষক এক প্রতিবেদনে লিখেছেন যে সীতাকুণ্ডে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মহাতীর্থ চন্দ্রনাথ ধামের অবিচ্ছেদ্য অংশ লবণাক্ষের মঠ-মন্দিরগুলো বিলুপ্ত হতে চলেছে। কয়েক শ বছরের পুরনো মন্দিরগুলো স্থাপনের পর থেকে সংস্কার না হওয়ায় এগুলো ভেঙে গাছপালা ও মাটি চাপা পড়েছে। ইতোমধ্যে নিশ্চিহ্নও হয়ে গেছে মন্দিরগুলোর অংশ বিশেষ। কিন্তু এ নিয়ে মাথা ব্যথা নেই কারো। ফলে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে তীর্থভূমি।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন পৃথিবীর সকল তীর্থদর্শন করেও কেউ যদি চন্দ্রনাথ ধাম দর্শন না করেন তবে তীর্থ দর্শন সম্পন্ন হয় না। আবার এই চন্দ্রনাথ মহাতীর্থের তিনটি অবিচ্ছেদ্য অংশ রয়েছে।
উত্তরে ছোট দারোগার হাটে লবণাক্ষ ও দক্ষিণে বাড়বকুণ্ডে বাড়বানল। কেউ চন্দ্রনাথ তীর্থ করতে এলে তাকে অবশ্যই একই সাথে লবণাক্ষ ও বাড়বানল দর্শন করতে হয়। নইলে চন্দ্রনাথ দর্শনও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
এ কারণে চন্দ্রনাথের পাশাপাশি লবণাক্ষ ও বাড়বানল সমান গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু প্রচারের অভাবে বহু সনাতন ধর্মাবলম্বী এসব তথ্য অবগত নন।
চন্দ্রনাথ ধামের প্রচারণা চালালেও লবণাক্ষ ও বাড়বানলের কথা তেমন একটা প্রচার করেন না।
সূত্র জানায়, চন্দ্রনাথ ধাম, লবণাক্ষ ও বাড়বানল একই তীর্থের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও এগুলো পৃথক পৃথক মোহন্তের অধীনে। এর আয় ব্যয়ও যার যার ওপর বর্তায়। ফলে যেটি যার অধীনে তারাই শুধু সেটি নিয়ে ভাবেন। অন্য অংশটি থাকল কি হারিয়ে গেল এ নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই। অন্যদিকে পৌরসদরে সুলভ যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে চন্দ্রনাথে সারাবছর দর্শনার্থীর আগমন হলেও লবণাক্ষ বা বাড়বানলে পুণ্যার্থীর সংখ্যা কম। কেবলমাত্র শিব চতুর্দশী, দোল পূর্ণিমাসহ কিছু কিছু বিশেষ তিথিতে এখানে পুণ্যার্থীর ঢল নামে। কিন্তু ধর্মীয় দিক থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হলেও এসব তীর্থের উন্নয়ন নিয়ে মাথা ব্যথা নেই কারো। আর দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে অবহেলায় পড়ে থাকতে থাকতে বর্তমানে লবণাক্ষ তীর্থের মঠ-মন্দিরগুলো বিলুপ্ত হতে চলেছে। ছোট দারোগার হাটে অবস্থিত লবণাক্ষ তীর্থে লবণাক্ষ মন্দির, ব্রহ্ম কুণ্ড, সূর্যকুণ্ড ও অগ্নিকুণ্ড মন্দিরগুলো বিলুপ্তের পথে। এগুলো খুঁজে পাওয়াই মুস্কিল হয়ে পড়েছে। লবণাক্ষ মন্দিরটি এখন আর মন্দিরের অবস্থায় নেই।
এর অধিকাংশই পাহাড়ের গাছপালা ও জলাধার নির্মাণকালে খননে উত্তোলন করা মাটির নিচে চাপা পড়েছে। আর সামনের অংশটি দেখা গেলেও সেখানে পূজা অর্চনা করার পরিবেশ নেই। ফলে সেখানে এখন আর নিয়মিত পূজা অর্চনা হয় না। একই অবস্থা অন্য মন্দিরগুলোর। সেখানেও গিয়েও ব্রহ্মকুণ্ড, সূর্যকুণ্ড ও অগ্নিকুণ্ড খুঁজে পাওয়া মুস্কিল হয়ে পড়েছে।
লবণাক্ষ তীর্থের ৩০ একরের মতো সম্পদ আছে। এর ১৬-১৭ একরের মতো বেদখল হয়ে গেছে। এগার বছর মামলা পরিচালনা করে তিন একর উদ্ধার হয়েছে। অন্য সম্পত্তি উদ্ধারে মামলা চলছে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র তীর্থস্থান চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ ধামের পবিত্রতা নষ্টের চেষ্টা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক প্রচারণার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের এস রহমান হলে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে শ্রীশ্রী চন্দ্রনাথ ধাম রক্ষা পরিষদ এবং বাড়বকুণ্ড তীর্থধাম উন্নয়ন কমিটি। এ সময় চট্টগ্রামের বিভিন্ন সনাতনী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে দেবোত্তর সম্পত্তি আত্মসাতের ষড়যন্ত্র, বাড়বকুণ্ড তীর্থধামের অধিষ্ঠাত্রী দেবী শ্রীশ্রী জ্বালামুখি কালী বিগ্রহের দেবোত্তর সম্পত্তি জাল জালিয়াতির মাধ্যমে দখলের চেষ্টা ও সেবায়েতদের ওপর হামলা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের প্রতিবাদ জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন চন্দ্রনাথ ধাম রক্ষা পরিষদ এবং বাড়বকুণ্ড তীর্থধাম উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক ও পুন্ডরীক ধামের অধ্যক্ষ চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী।
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পার্টির যুগ্ম মহাসচিব দিদারুল আলম দিদারের বিরুদ্ধে বাড়বকুণ্ড তীর্থধামের সেবায়েতদের ওপর হামলা এবং দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের চেষ্টার অভিযোগ তোলা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ১০ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো দেবোত্তর সম্পত্তির সেবায়েতদের জানমালের নিরাপত্তা প্রদানে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ, দেবোত্তর সম্পত্তি সংরক্ষণ ও বেদখলমুক্ত করার জন্য খসড়া আইনের বিষয়ে হিন্দু সংগঠনের প্রস্তাবিত সংশোধনীসমূহ যুক্ত করে অবিলম্বে আইন পাশ ও কার্যকর, সীতাকুণ্ড স্রাইন কমিটির পক্ষ থেকে ডাকাত শহীদ গংদের বরাবরে বেআইনিভাবে প্রদত্ত দেবোত্তর সম্পত্তির বন্দোবস্তি বাতিল ও উচ্ছেদ, সীতাকুণ্ড স্রাইন কমিটির পক্ষ থেকে স্থানীয় হিন্দু জনসাধারণ ও সনাতনী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সমন্বয় করে দেবোত্তর সম্পত্তির এলাকা সুচিহ্নিত করে অবিলম্বে নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ, অবাধ যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ ও বেদখলীয় সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, স্রাইন কমিটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকল্পে যাবতীয় হিসাব নিকাশ ও কর্মকান্ড সনাতনী জনসম্মুখে প্রকাশ, সীতাকুণ্ডের শ্রীশ্রী চন্দ্রনাথ ধাম ও বাড়বকুণ্ড তীর্থ ধামকে জাতীয় তীর্থস্থান ঘোষণা করে সংরক্ষণের জন্য সরকারিভাবে যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। উভয় ধামের সম্পত্তিগুলো রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থাগ্রহণ করতে হবে। যেসব সম্পত্তি বেদখল হয়েছে সেগুলো পুনরুদ্ধার এবং যেসব জায়গার ভুয়া কাগজপত্র বাতিলের ব্যবস্থা করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শ্রীশ্রী চন্দ্রনাথ ধাম নিয়ে বিভিন্ন উস্কানিমূলক সাম্প্রদায়িক প্রচারণা বন্ধ এবং এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে। এছাড়া যারা বিভিন্নভাবে সনাতন ধর্ম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কটুক্তি করে বা প্রচারণা চালায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সারাদেশে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের বলি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার এবং যারা কারাগারে আছে তাদের নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে।
এছাড়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পীঠস্থান বাড়বকুণ্ড তীর্থধামে স্থায়ী নিরাপত্তা চৌকি প্রতিষ্ঠা, বিভিন্ন মঠ ও মিশনের প্রধানদের সমন্বয়ে চন্দ্রনাথধামের আধ্যাত্মিক মান সুনিশ্চিতকল্পে একটি যৌথ সেল গঠন করতে হবে ও মোহন্ত নিয়োগ সুনিশ্চিত, সীতাকুণ্ডের লবণাক্ষ ও কুমারীকুণ্ডের দেবোত্তর সম্পত্তি খাস বাতিল করে পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাড়বকুণ্ড শ্রীশ্রী জ্বালামুখী কালী বিগ্রহের সেবায়েত চিরকুমারী ব্রহ্মচারীনি স্মৃতিলতা ভারতী, সনাতন বিদ্যার্থী সংসদের প্রতিষ্ঠাতা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কুশল বরণ চক্রবর্তী, দৈনিক চট্টগ্রাম প্রতিদিনের উপদেষ্টা সম্পাদক ও চট্টগ্রাম পতেঙ্গা মহাবারুণী ও গঙ্গাস্নান কমিটির প্রধান উপদেষ্টা আয়ান শর্মা, বাংলাদেশ গীতা শিক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শুভাশীষ শর্মা, সাংবাদিক বিপ্লব পার্থ, সনাতনী জাগরণী সংঘের সভাপতি কাঞ্চন আচার্য্য, জাগো হিন্দু পরিষদ চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি রুবেল কান্তি দে, হিন্দু মহাজোট চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি অ্যাডভোকেট যীশু রক্ষিত, অ্যাডভোকেট মিঠুন বিশ্বাস, আদিপুরুষ শ্যাম দাস ব্রহ্মচারী, সেবায়েত কালী নারায়ণ ভারতী, সেবায়েত মিঠুন কৃষ্ণ ভারতী।
১০ দফা দাবি আদায়ের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন এবং সেই আন্দোলন সারাদেশে ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী করার ঘোষণা দেন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। যারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করছে তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কটের দাবি তোলা হয় সংবাদ সম্মেলনে।
জানা গেছে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলায় অবস্থিত চন্দ্রনাথ ধাম সারাবিশ্বের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান একটি তীর্থভূমি।
পুরাণ মতে এখানে যুগে যুগে এসে অবস্থান করেছিলেন ভগবান শ্রী রামচন্দ্র, লক্ষণ, সীতা দেবী, মহর্ষি ব্যাসদেবসহ অসংখ্য দেব-দেবতা ও মুনি ঋষি। এখানে স্বয়ং আবির্ভূত হয়েছিলেন দেবাদিদেব মহাদেব।