আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চলমান সহিংসতা ও নিপীড়নে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তাদের সুরক্ষায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশন মোতায়েনের আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংগঠন ‘গ্লোবাল বেঙ্গলি হিন্দু প্ল্যাটফর্ম’ (GBHP)।
যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্সের প্রবীণ সাবেক এমপি ও সংগঠনটির চেয়ারম্যান বীরেন্দ্র শর্মা স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কাছে এই জরুরি অনুরোধ জানানো হয়েছে।
গতকাল ১৯ ডিসেম্বর (শুক্রবার) পাঠানো এই চিঠিতে সংগঠনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার পরিসংখ্যান এবং সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরা হয়।
চিঠিতে উল্লেখিত পরিসংখ্যান ও উদ্বেগ
চিঠিতে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের (BHBCUC) তথ্যের বরাত দিয়ে জানানো হয়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে ২,৪৪২টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে হত্যা, ধর্ষণ, উপাসনালয় ভাঙচুর, জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং সাম্প্রদায়িক হামলা অন্তর্ভুক্ত। চিঠিতে দাবি করা হয়, শুধুমাত্র ৪ থেকে ২০ আগস্ট ২০২৪—এই স্বল্প সময়ের মধ্যে ২,১০০টি ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১,৭৬৯টি ছিল সরাসরি সাম্প্রদায়িক আক্রমণ। ২০২৫ সালে অন্তত ২৫টি মন্দির ধ্বংস এবং ২০টি হিন্দু বাড়িতে সুনির্দিষ্ট হামলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড ও বিচারহীনতা
চিঠিতে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় সাম্প্রতিক এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তুলে ধরা হয়। অভিযোগ করা হয়, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ রাতে ‘পায়োনিয়ার নিট কম্পোজিট’ কারখানায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে দিপু চন্দ্র দাস নামের এক শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা করে একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী। হত্যার পর তার মরদেহ মহাসড়কে টেনে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। চিঠিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে অপরাধীদের মুখ দেখা গেলেও স্থানীয় পুলিশ এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করেনি।
জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের আইনি ভিত্তি
চিঠিতে জাতিসংঘের সনদের অধ্যায় ৬ এবং অধ্যায় ৭-এর উল্লেখ করে বলা হয়, যখন কোনো রাষ্ট্র তার ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন নিরাপত্তা পরিষদ হস্তক্ষেপ করতে পারে। ‘বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা’ (POC) ম্যান্ডেট এবং ‘রক্ষার দায়বদ্ধতা’ (R2P) নীতির আওতায় বাংলাদেশে শান্তিরক্ষী মোতায়েনের আইনগত ভিত্তি রয়েছে বলে চিঠিতে দাবি করা হয়।
দাবি ও সুপারিশ
গ্লোবাল বেঙ্গলি হিন্দু প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের কাছে সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ করা হয়েছে:
১. অবিলম্বে নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ‘বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা’ (POC) ম্যান্ডেটসহ শান্তিরক্ষী মিশন অনুমোদন করা।
২. ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জানমাল ও উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৩. সহিংস ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় সহায়তা প্রদান।
চিঠির শেষে বীরেন্দ্র শর্মা উল্লেখ করেন, “জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশন মোতায়েন শুধুমাত্র বাংলাদেশের মানবাধিকার রক্ষার বাধ্যবাধকতা সমুন্নত রাখবে না, বরং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও শক্তিশালী করবে।”
উল্লেখ্য, গ্লোবাল বেঙ্গলি হিন্দু প্ল্যাটফর্ম যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত একটি চ্যারিটি সংস্থা, যা বিশ্বজুড়ে বাঙালি হিন্দুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করে আসছে।