অাধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে ধনের যথেষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বিনিময়ের মাধ্যম হলো টাকা পয়সা অর্থ ধন। অার এই ধনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন লক্ষ্মী। তাই হাজার হাজার বছর ধরে সনাতনী সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে লক্ষ্মী পুজা হয়ে অাসছে। শরৎকালে দুর্গা পুজার পর যে পুর্ণিমায় লক্ষ্মী পুজা হয় তার নাম কোজাগরি লক্ষ্মী পুজা "কো জাগ ইতি " হতে কোজাগর শব্দের উৎপত্তি, এর অর্থ হলো কে জেগে অাছো? পুরাণের মতে ঐদিন রাত্রে লক্ষ্মী দেবী এসে বলেন কে জেগে অাছো? অাজ আমি তোমাকে ধন দেব। এজন্য কোজাগরি পুর্ণিমার রাত্রে জাগরণ থাকার প্রথা বিদ্যমান। ধনী দরিদ্র ব্রাহ্মণ থেকে শুদ্র নির্বিশেষে সবাই লক্ষ্মী পুজা করে থাকেন। প্রতিমা বা ঘটে উভয় ভাবে লক্ষ্মী পুজা করা যায়।ঋগবেদে শ্রী ও ঐশ্বর্যের দেবী অর্থে লক্ষ্মীর নাম পাওয়া যায়। লক্ষ্মী শব্দের ব্যাখ্যা হলো যিনি সর্বদা সকলকে স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে দেখেন।শত পথ ব্রাহ্মনে প্রজাপতি হতে শ্রীর উৎপত্তি বলা হয়েছে।পরবর্তী যুগে শ্রী ও ঐশ্বর্যের দেবী বিষ্ণুর পত্নী রুপে খ্যাত।

রামায়ণে বর্নণায় দেখা যায় দেবতা ও অসুরেরা মিলে সমুদ্র মন্তন কালে দেবী লক্ষ্মী পদ্ম হস্তে সমুদ্র হতে উত্থিত হন। নারদীয় ও কুর্ম পুরাণে বলা হয়েছে লক্ষী সরস্বতী কার্তিক গণেশ, শিব ও দুর্গার সন্তান। লক্ষ্মী দেবী দ্বিভূজ, চতুর্ভুজ কদাচিৎ বহুভুজ। গুপ্ত পরবর্তী যুগে কিছু মুদ্রাতে অষ্টাভুজা ও ষোড়শভুজা লক্ষ্মী মুর্তি পাওয়া গিয়েছে। লক্ষ্মী দেবী পদ্মাসনা বা পদ্মাহস্তা, তপ্তকাঞ্চনবর্ণা। শ্রী সুক্তে লক্ষ্মীকে পদ্মা, পদ্মাবর্ণা, পদ্মস্থিতা ও আদ্রা বলা হয়েছে। ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরাণে দেবী লক্ষ্মী, দুর্গা, সরস্বতী, সাবিত্রী, রাধা প্রমুখ পঞ্চপ্রকৃতির অন্যতম বলে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। দেবী লক্ষ্মীর বাহন হলো পেচক,তবে প্রাচীন মুর্তিতে দেবী কোথাও হস্তিবাহনা, কোথাও সিংহবাহনা কোথাও কচ্ছপবাহনা। দেবীর ১০৮টি নাম রয়েছে। এগুলো হলঃ১) প্রকৃতি ,২) বিক্রুতি, ৩) বিদ্যা , ৪) সর্বভূতহিতপ্রদা, ৫) শ্রদ্ধা , ৬) বিভূতি, ৭) সুরভি, ৮) পরমাত্মিকা , ৯) জয়প্রদা , ১০) পদ্মালয়া , ১১) পদ্মা , ১২) শুচী, ১৩) স্বাহা, ১৪) স্বাধা, ১৫) সুধা , ১৬) ধন্যা , ১৭) হিরন্ময়ী, ১৮) লক্ষ্মী , ১৯) নিত্যাপুষ্টা, ২০) বিভা, ২১) অদিত্যা, ২২) দিত্যা, ২৩) দীপা, ২৪) বসুধা, ২৫) ক্ষীরোদা, ২৬) কমলাসম্ভবা, ২৭) কান্তা, ২৮) কামাক্ষী, ২৯) ক্ষীরোদসম্ভবা , ৩০) অনুগ্রহাপ্রদা, ৩১) ঐশ্বর্য্যা , ৩২) অনঘা, ৩৩) হরিবল্লভী, ৩৪) অশোকা , ৩৫) অমৃতা, ৩৬) দীপ্তা, ৩৭) লোকাশোকবিনাশিনী, ৩৮) ধর্মনিলয়া, ৩৯) করুণা, ৪০) লোকমাতা, ৪১) পদ্মপ্রিয়া, ৪২) পদ্মহস্তা, ৪৩) পদ্মাক্ষী , ৪৪) পদ্মসুন্দরী, ৪৫) পদ্মভবা, ৪৬) পদ্মমুখী, ৪৭) পদ্মনাভপ্রিয়া, ৪৮) রমা, ৪৯) পদ্মমালাধরা , ৫০) দেবী,৫১) পদ্মিনী, ৫২) পদ্মগন্ধিণী , ৫৩) পুণ্যগন্ধা, ৫৪) সুপ্রসন্না, ৫৫) শশীমুখী , ৫৬) প্রভা, ৫৭) চন্দ্রবদনা, ৫৮) চন্দ্রা , ৫৯) চন্দ্রাসহোদরী , ৬০) চতুর্ভুজা , ৬১) চন্দ্ররূপা , ৬২) ইন্দিরা, ৬৩) ইন্দুশীতলা, ৬৪) আহ্লাদিণী, ৬৫) নারায়নী , ৬৬) বৈকুন্ঠেশ্বরি ৬৭) হরিদ্রা ৬৮) সত্যা , ৬৯) বিমলা, ৭০) বিশ্বজননী, ৭১) তুষ্টি, ৭২) দারিদ্রনাশিণী, ৭৩) ধনদা , ৭৪) শান্তা, ৭৫) শুক্লামাল্যাম্বরা , ৭৬) শ্রী, ৭৭) ভাস্করী , ৭৮) বিল্বনিলয়া , ৭৯) হরিপ্রিয়া , ৮০) যশস্বীনি , ৮১) বসুন্ধরা , ৮২) উদারঙ্গা, ৮৩) হরিণী , ৮৪) মালিনী, ৮৫) গজগামিনী , ৮৬) সিদ্ধি , ৮৭) স্ত্রৈন্যাসৌম্যা , ৮৮) শুভপ্রদা, ৮৯) বিষ্ণুপ্রিয়া , ৯০) বরদা , ৯১) বসুপ্রদা, ৯২) শুভা , ৯৩)চঞ্চলা , ৯৪) সমুদ্রতনয়া , ৯৫) জয়া , ৯৬) মঙ্গলাদেবী, ৯৭) বিষ্ণুবক্ষাস্থলাসিক্তা , ৯৮) বিষ্ণুপত্নী, ৯৯) প্রসন্নাক্ষী , ১০০) নারায়নসমাশ্রিতা ,
১০১) দারিদ্রধ্বংসিণী, ১০২) কমলা, ১০৩) সর্বপ্রদায়িনী, ১০৪) পেঁচকবাহিণী, ১০৫) মহালক্ষ্মী, ১০৬) ব্রহ্মাবিষ্ণুশিবাত্মিকা , ১০৭) ত্রিকালজ্ঞানসম্পূর্ণা, ১০৮) ভুবনমোহিনী।
প্রাতঃকালে মা লক্ষ্মীর নিম্নলিখিত নাম উচ্চারনে দারিদ্রতা নিবারণ হয়ঃ-
লক্ষ্মীঃ শ্রীঃ কমলা বিদ্যা মাতা বিষ্ণুপ্রিয়া সতী ।
পদ্মালয়া পদ্মহস্তা পদ্মাক্ষী পদ্মসুন্দরী ।।
ভূতানামীশ্বরী নিত্যা মতা সত্যাগতা শুভা ।।
বিষ্ণুপত্নী মহাদেবী ক্ষীরোদতনয়া ক্ষমা ।।
অনন্তলোকলাভা চ ভূলীলা চ সুখপ্রদা ।
রুক্মিনী চ তথা সীতা মা বৈ বেদবতী শুভা ।
এতানি পুণ্যনামানি প্রাতরুত্থায় যঃ পঠেৎ ।
মহাশ্রিয়মবাপ্নোতি ধনধান্যমকল্মষম্ ।।

দেবী ধন ও ঐশ্বর্যের দেবীরুপে পরিণত হয়ে ব্যাপকভাবে পুজা পেয়ে আসছেন। দেবী স্বর্গে স্বর্গলক্ষ্মী, পৃথিবীতে ধনলক্ষ্মী, রাজাদের গৃহে রাজলক্ষ্মী,সবার গৃহে তিনি গৃহলক্ষ্মী।
আসল কথা হলো লক্ষ্মী দেবী হলের সকল জীবের শ্রী ঐশ্বর্য সৌভাগ্য শোভা সম্পদ। আবার যখন বিষ্ণু রামরূপে অবর্তীণ হলেন তখন লক্ষী হয়েছেন সীতা, কৃষ্ণ জন্মে লক্ষ্মী হয়েছেন রুহ্মিণী, বিষ্ণুর দেবদেহে হয়েছেন লক্ষ্মী দেবী বা লক্ষ্মী নারায়ণ। অার্য ঋষিম
রা চিন্তাভাবনা করেছেন যুগ যুগ ধরে কিভাবে মানুষের জীবনযাত্রা ও সমাজ ব্যবস্থা সুন্দর করা যায়। পুজা পার্বন তাদেরই ধ্যান, ধারণা, পরীক্ষা নিরীক্ষা ও গভেষণা লব্ধ জ্ঞান অমূল্য সম্পদ। পুজা পার্বণ,সাধন ভজন, অানন্দ উৎসব, মানুষের জীবনকে সুন্দর, সুখময়, ও নিরাপদ করে।তেমনিভাবে সৌভাগ্য কামণায় লক্ষ্মী প্রত্যেক হিন্দুর ঘরে পুজিত হন। আজ কোজাগরি লক্ষ্মী পুজা দিবসে মায়ের কাছে প্রার্থনা জানাই, মায়ের আশীর্বাদে সকলের ঘরে ধনে সম্পদে ভরে যাক।আমি বাংলাদেশ জাতীয় সংস্কৃতি ও প্রাচ্যবিদ্যা প্রচার পরিষদ ঢাকা কেন্দ্রীয় কমিচির পক্ষ থেকে দেশবাসী সহ অান্তর্জাতিকভাবে জানাই পৃজার বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। জয় মা লক্ষ্মী।
অধ্যক্ষ মিলন চন্দ্র দেবনাথ